ইন্টারনেট রচনা শিখুন।

ক্লাস 6 - 8 ইন্টারনেট রচনা শিখুন।

ইন্টারনেট
সূচনা :
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যােগাযােগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনয়ন করেছে ইন্টারনেট। এটা কম্পিউটারে এমনই এক সংযােগ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থে সারা বিশ্বই চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। এর মাধ্যমে যােগাযােগের ক্ষেত্রে নবদিগন্ত সূচিত হয়েছে। এর পাশাপাশি তথা প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। 
ইন্টারনেট :
অসংখ্য নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বব্যাপী বৃহৎ কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে ‘ইন্টারনেট বলা হয়। অর্থাৎ ইন্টারনেট হলাে নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক তথা নেটওয়ার্কের রাজা। এর মাধ্যমে সারাবিশ্বের কম্পিউটারগুলাে একই সূত্রে গ্রথিত হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনাে স্থান থেকে যেকোনাে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেকোনাে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি যােগাযােগ কিংবা সংবাদ আদানপ্রদান করতে পারে। 
ইন্টরনেট ধারণার উদ্ভব ও বিকাশ :
১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনী সর্বপ্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা মাত্র ৪টি কম্পিউটারের মধ্যে গড়ে তুলেছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী অভ্যন্তরীণ এক যােগাযােগ ব্যবস্থা। এই যােগাযােগ ব্যবস্থার নাম ছিল ‘ডপার্নেট’। ক্রমশ চাহিদার ভিত্তিতে ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন সর্বসাধারণের জন্য এরকম অন্য একটি যােগাযােগ ব্যবস্থা চালু করে। এর নাম দেওয়া হয় ‘নেস্ফোনেট’। ৩ বছরের মধ্যে নেস্ফোনেট-এর বিস্তার সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইতােমধ্যে গড়ে ওঠে আরও অনেক ছােট-মাঝারি নেটওয়ার্ক। 
এতে এর ব্যবস্থাপনায় কিছুটা অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এ অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে পুরাে ব্যবস্থাটি নিয়ন্ত্রণের আবশ্যকতা দেখা দেয়। এজন্য একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তােলা হয়। বিশ্বের মানুষ পরিচিত হয় ‘ইন্টারনেট’ নামক একটি ধারণার সাথে। বর্তমান বিশ্বে এর প্রায় ২০০ কোটি সদস্য। এ সংখ্যা প্রতি মাসে শতকরা ১০ ভাগ হারে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। 
ইন্টারনেট যেভাবে কাজ করে :
ইন্টারনেট নামক যােগাযােগ ব্যবস্থাটি কোনাে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এর কোনাে মূল কেন্দ্রও নেই। এক Server থেকে আরেক Server-এর সংযােগের ফলেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বিশাল Internet Networking সাম্রাজ্য। Server-এর মাধ্যমে এর কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধান প্রধান শহরে স্থাপিত হয়েছে একাধিক Server। যেকোনাে স্থান থেকে যেকোনাে একটি Server-এর সাথে যােগাযােগ স্থাপন করলেই বিশ্বের সকল Server-এর সাথে যােগাযােগ স্থাপিত হয়। 
ইন্টারনেটের গুরুত্ব :
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেটের গুরুত্ব অপরিসীম। তথ্য প্রেরণ ও গ্রহণ থেকে শুরু করে বিশ্বের সকল প্রান্তের মানুষের সাথে আড্ডা, সম্মেলন, শিক্ষা, বিপণন, অফিস ব্যবস্থাপনা, বিনােদন ইত্যাদিও ইন্টারনেটের সাহায্যে সম্ভব হচ্ছে। মাল্টিমিডিয়ার বিকাশের সাথে সাথে প্রতিদিন এর সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। একটি লােকাল টেলিফোন খরচে পৃথিবীর এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। মহাকাশ গবেষণায় ইন্টারনেট বিজ্ঞানীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে চলেছে। প্রচার মাধ্যম সহজতর হয়েছে। মূলত নিম্নলিখিত সুবিধাগুলাে দিচ্ছে বলেই ইন্টারনেটের গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। 
ই-মেইল : ই-মেইলের কার্যকারিতা অনেকটা ফ্যাক্সের মতােই। প্রেরক কম্পিউটারে তার বক্তব্য টাইপ করে সাথে সাথে তা এক বা একাধিক প্রাপক টারমিনালের কাছে একই সময়ে নেটওয়ার্কিং প্রক্রিয়ায় পাঠিয়ে দিতে পারেন। 
ওয়েব : ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত কম্পিউটারগুলােতে যেসব তথ্য রাখা হয়েছে, সেগুলাে ব্যবহার করার ব্যবস্থাকে ‘ওয়েব’ বলা হয়। সাধারণত বড় ধরনের কোম্পানি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করে নেটওয়ার্কে রেখে দেয় সাধারণের ব্যবহারের জন্য। কোম্পানি সম্পর্কে তথ্যাদি ছাড়াও চাকরি বা ডিলারের জন্য আবেদনপত্র ওয়েবসাইটে থাকে। 
চ্যাট : এ প্রক্রিয়ায় যে কেউ এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে একই সময়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে আড্ডা জমিয়ে তুলতে পারে। 
নেট নিউজ : এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কেউ ইন্টারনেট তথ্যভান্ডারে যেকোনাে সংবাদ সংরক্ষণ করে তা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে। 
গুগল : গুগল ইন্টারনেটে তথ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে স্থাপিত একটি পদ্ধতি বিশেষ। এটি তথ্যের সমন্বয় করে এবং ব্যবহারকারীর প্রয়ােজন অনুসারে তথ্য খুঁজে দেয়। 
ইন্টারনেটের অপকারিতা :
ইন্টারনেটের ব্যাপক সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধা তথা ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মিথ্যা এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য প্রচার, পর্ণছবি দেখা, জুয়াখেলা, ব্ল্যাক মেইলিং ইত্যাদি মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাধ্যমে যেকোনাে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলেই ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে একসাথে হাজার হাজার কম্পিউটারে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ ও ইন্টারনেট :
১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ইন্টারনেট চালু হয়। তবে তখন এর ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত এবং তা কেবল ই-মেইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালে ইন্টারনেট সংযোগের প্রসার ঘটতে থাকে। ২০০০ সালের শুরুতে ইন্টারনেটের গ্রাহক ছিল প্রায় ৬০,০০০। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ তথ্য প্রযুক্তির মহাসড়ক সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হয়। এতে দেশে ইন্টারনেটের গতি অনেক বেড়ে যায়। ২০১৭ সাল নাগাদ সাবমেরিন ক্যাবলের দ্বিতীয় মহাসড়কে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।
বর্তমানে ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি। সরকার ইন্টারনেটের প্রসারে অনেক কাজ করে যাচ্ছে।
তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে করণীয় :
জ্ঞান বিজ্ঞান ও ইন্টারনেট ব্যবহারে নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করতে তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে এক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে পড়ছে, তারা এক ধরণের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, যাকে ডিজিটাল বৈষম্য বলা হয়। বাংলাদেশও এরূপ বৈষ্যমের শিকার। এই বৈষম্য দূর করতে চাইলে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো-
আমাদের তরুণ সমাজকে তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
ব্যাপক সংখ্যক জনগণের নিকট ইন্টারনেট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য তথ্য প্রযুক্তির অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
তথ্য প্রযুক্তির জগতে ভাষা হিসেবে ইংরেজির অধিপত্য একক। তাই ইংরেজির ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনসম্পদ এবং সরকার গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার :
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিই বর্তমান বিশ্বের সকল প্রকার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের মূল চালিকাশক্তি। এক্ষেত্রে যারা যতো বেশি অগ্রগামী, তারা ততো উন্নত। ইন্টারনেট এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি স্তরকে জয় করে মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু আমরা তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এখনও পিছিয়ে আছি। আমাদের উচিত হলো ইন্টারনেটের ব্যাপক ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের প্রসার ঘটিয়ে দেশকে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী করে গড়ে তোলা।

No comments

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.