এসএসসি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচনা শিখুন।

এসএসসি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচনা শিখুন
 

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

সূচনা:
বাংলার মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ছিলেন বাংলার মুসলিম নারীসমাজের আলােকবর্তিকা। বঙ্গ-ভারতের মুসলিম সমাজ যখন অশিক্ষা ও কুসংস্কারের আঁধারে নিমজ্জিত, অবরােধ ও অবজ্ঞায় এদেশের নারীসমাজ যখন জর্জরিত- সে তমসাচ্ছন্ন যুগে বেগম রােকেয়ার ন্যায় একজন মহীয়সী নারীর আবির্ভাব না ঘটলে এদেশের নারীশিক্ষা ও নারীজাগরণ সম্ভবপর হতাে কি না সন্দেহ। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন একজন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী। বেগম রোকেয়ার পূর্বপুরুষগণ মুগল আমলে উচ্চ সামরিক এবং বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োজিত ছিলেন। বিয়ের পরে তাঁর নাম হয় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তবে তিনি বেগম রোকেয়া নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।

জন্ম ও পরিবার:
১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অর্ন্তগত পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রােকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মাতার নাম রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। পিতা আরবি ও ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন এবং শিক্ষিত জমিদার ছিলেন। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা। রোকেয়ার তিন ভাই যাদের একজন শৈশবে মারা যায়। বড় দুই ভাইয়ের নাম মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের। দুজনেই ছিলেন বিদ্যানুরাগী। আর বড় বোন করিমুন্নেসা ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী। বেগম রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনে বড় দু’ভাই ও বোন করিমুন্নেসার যথেষ্ট অবদান ছিল। এ পরিবারে পর্দাপ্রথা এত কঠোর ছিল যে পরিবারের নারীরা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও চাকরানি ছাড়া অন্য কোনাে স্ত্রীলােকের সামনেও বের হতেন না। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই রােকেয়াকেও পর্দা প্রথা মেনে চলতে হতাে।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের শিক্ষাজীবন:
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের শিক্ষাজীবন তেমন সুখকর ছিল। শিক্ষা লাভের জন্য তাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল। তার পিতা আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হলেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন রক্ষণশীল। বেগম রােকেয়ার পরিবারে স্ত্রীলােকদের একমাত্র কুরআন শরিফ ছাড়া অন্য কিছু পড়তে দেওয়া হতাে না। পরিবারের লােক উর্দু ভাষায় কথা বলত। পুরুষেরা বাইরে ফারসি ও বাংলা পড়ত। পরিবারের প্রথা অনুযায়ী রােকেয়াকে বাড়িতেই কুরআন শরিফ পড়তে দেওয়া হয়। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করার সময় একজন মেম শিক্ষয়িত্রীর নিকট তিনি কিছুদিন লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ ও আত্মীয়স্বজনদের ভ্রুকুটির জন্য তাও বন্ধ করে দিতে হয়।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের বৈবাহিক জীবন:
১৮৯৮ সালে বেগম রোকেয়া বিহারের ভাগলপুর নিবাসী উর্দুভাষী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তদুপরি সমাজসচেতন, কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। রোকেয়ার শৈশব কাল কষ্টে কাটলেও বৈবাহিক জীবন জীবন ছিল আনন্দের। কারণ স্বামীর সাহচর্যে এসেই বেগম রোকেয়ার জ্ঞানচর্চার পরিধি বিস্তৃত হয়। 
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাহিত্যচর্চা:
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় তার স্বামীর হাত ধরেই। তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় বেগম রোকেয়ার জ্ঞানার্জনের পথ অধিকতর সুগম হয়।কেউ কেউ বলেন তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে নবনূর পত্রিকায়। আবার অনেকেই মনে করেন প্রথম লেখা ‘পিপাসা’ (মহরম) প্রকাশিত হয় ইংরেজি ১৯০২ সালে নবপ্রভা পত্রিকায়।

বেগম রোকেয়ার কর্মজীবন:
স্বামী ও কন্যা সন্তানের মৃত্যুর পর রোকেয়া নিঃসঙ্গ হয়ে পরেন। শৈশবের সকল বাধা-বিপত্তির অবসান ঘটিয়ে বৈবাহিক জীবনে সুখের আলোর দেখা মিললেও সে আলো বেশি দিন তাকে আলোকিত করে নি। নিঃসঙ্গ রোকেয়া স্বামীর অনুপ্রেরণাকে বুকে ধারণ করে নিজেকে নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায়, স্বামীর দেওয়া অর্থে পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে ১৯০৯ সালে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন। সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার কারণে স্কুল বন্ধ করতে বাধ্য হন। পরে কলকাতায় চলে আসেন। হার না মানা মহীয়সী এই নারী স্বামীর প্রতি অগাধ ভালোবাসার টানে ১৯১১ সালের ১৫ মার্চ আবারও চালু করলেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি চার বছরের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে ১০০ জনে পৌঁছুতে সক্ষম হন। ১৯৩০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটি পুর্ণাঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি রোকেয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখেন। ১৯১৬ সালে, তিনি মুসলিম বাঙালি নারী সংগঠন আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩০ সালে বেঙ্গল মুসলিম কনফারেন্সে রোকেয়া বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো বিবৃতি দেন, যা সেই যুগের প্রেক্ষাপটে একটি দুঃসাহসিক কাজ ছিল।

বাংলা সাহিত্যে রোকেয়ার অবদান:
সাহিত্যিক হিসেবে তৎকালীন যুগের প্রেক্ষাপটে রোকেয়া ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। ছোটবেলা থেকেই তিনি লিখালিখি করতেন।নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, The Mussalman, Indian Ladies Magazine প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।
শিক্ষিকা হিসাবে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের শৈশবকাল চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকলেও জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার ছিল না। গভীর রাতে সকলে ঘুমিয়ে গেলে মোমবাতির আলোতে বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে ইংরাজী ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করতেন।তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল। তাঁর স্কুলে মেয়েদের পাঠাবার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি অভিভাবকদের অনুরোধ করতেন।স্কুলে তফসিরসহ কুরআন পাঠ থেকে আরম্ভ করে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি, হোম নার্সিং, ফার্স্ট এইড, রান্না, সেলাই, শরীরচর্চা, সঙ্গীত প্রভৃতি বিষয়ই শিক্ষা দেওয়া হতো।পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে সরকার কলকাতায় ‘মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুল’ স্থাপন করে।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের রচনাবলী
স্বামীর হাত ধরেই সাহিত্য জগতে পা রাখেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তার সব লেখাতেই নারীবাদী চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। রোকেয়ার উলে­খযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে: Sultana’s Dream। যার অনূদিত রূপের নাম সুলতানার স্বপ্ন। যা ১৯০৫ মাদ্রাজের দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিন (The Indian Ladies’ Magazine)-এ প্রকাশিত হয়।

বেগম রোকেয়ার মৃত্যু:
নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং আলোর দিশারী বেগম রোকেয়ার জীবনকাল ছিল মাত্র বায়ান্ন বছর। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি উত্তর কলকাতার সোদপুরে শায়িত আছেন।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি:
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্মরণে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ এর নামকরণ করা হয় ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি ছিল নারীর নামে বাংলাদেশে প্রথম কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির নাম পরিবর্তন করেছিলেন।
প্রতি বছর ৯ ই ডিসেম্বর তার জন্মদিনে ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ পালিত হয় এবং নারী উন্নয়নে অবদানের জন্য বিশিষ্ট নারীদের বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করা হয়।
১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীনিবাস এর নাম দেওয়া হয় ‘রোকেয়া হল’ যার পূর্ব নাম ছিল উইমেন্স হল’।
বেগম রোকেয়ার অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসনের জন্য আবাসিক হল “রোকেয়া হল” নামকরণ করা হয়।
১৯৮০ সালে, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বেগম রোকেয়ার জন্মশতবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
২০০৪ সালে, বেগম রোকেয়া বিবিসি বাংলার ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ ভোটে ষষ্ঠ ভোট পেয়েছিলেন।সেই জরিপে প্রথম নামটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের।

বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র:
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলাধীন পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার নিজ বাড়ী সংলগ্ন ৩.১৫ একর ভূমিতে নারী জাগরণের পথিকৃত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্মৃতি রক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় ৩,৫৩,০০,০০০ টাকা ব্যয়ে ১ জুলাই, ২০০১ সালে বেগম রোকেয় স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপিত হয়। এতে অফিস ভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, ৪ তলা ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কক্ষ,লাইব্রেরি ইত্যাদি রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

উপসংহার:
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এক মহীয়সী নারীর নাম। বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী। যার আবির্ভাবে নারীরা পেয়েছিল সম্মান, সমঅধিকার। মোমবাতির আলোতে যিনি লুকিয়ে লুকিয়ে ভাইয়ের কাছ থেকে শিক্ষা অর্জন করেছিলেন, তিনি আজ প্রত্যেক নারীর হাঁতে তুলে দিয়েছেন আলোক বর্তিকা। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন, সন্তানকে হারিয়েছেন কিন্তু কখনো মনোবল হারাননি। শিক্ষাই পারে নারীকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে একথা বুকে লালন করে সারাটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নারীর মুক্তির জন্য। রোকেয়া অলঙ্কারকে দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করেছেন এবং নারীদের অলঙ্কার ত্যাগ করে আত্মসম্মানবোধে উজ্জীবিত হয়ে আর্থরাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সচেষ্ট হতে আহ্বান জানিয়েছেন। নারী দাসী নয় বরং নারী এ সমাজের অর্ধাঙ্গ। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রত্যেক নারীর কাছে উদাহরণ হয়ে থাক।

No comments

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.