এসএসসি সময়ানুবর্তিতা রচনা শিখুন।

 

সময়ানুবর্তিতা

ভূমিকা:

একটি সফল জীবনের যে চরিত্রগুণ থাকে তার মধ্যে সময়ানুবর্তিতার মতাে উত্তম গুণটিও বিদ্যমান থাকে। বিচিত্র কর্মপ্রবাহে বিকশিত জীবন অর্থবহ করে তােলার অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে ময়ানুবর্তিতাকে বিবেচনা করা চলে।সময়ানুবর্তিতাকে পরিত্যাগ করে মনুষ্যজীবন কৃতকার্যময় হয়ে উঠতে পারে না নিজের সম্ভাবনা বা প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে চাইলেও সময়ানুবর্তী হতে হবে, কেননা সময়ের সঠিক এবং সফল ব্যবহারই মানুষকে যথা সময়ে যথা কাজটি সম্পাদনে সহায়তা করে। তাই সময়ের অনুবর্তী হতে পারলেই জীবনকে সফল করে তােলা সম্ভব।

সময়ানুবর্তিতা কী:

মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটা বিশেষ কর্তব্যের আহ্বান নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়। প্রতিটি আহ্বানে সাড়া দিতে হলে সময়ের কাজ সময়ে সমাপ্ত করতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে সম্পাদনের উদ্যোগকেই সময়ানুবর্তিতা বলে। যে সময় যে কর্তব্যের ডাক আসে ঠিক তখনই তা না করলে ঐ মুহূর্তটি নিষ্ফল হয়ে যায়। সংসারে কাজের জন্য নির্ধারিত সময়ে বিশেষ কাজটি সম্পাদন করাতেই সময়ানুবর্তিতার প্রকাশ ঘটে। দ্রুত চলমান সময়ের মহাকালের মধ্যে মানবজীবনকে কল্পনা করতে গেলে মানবজীবন অতি সামান্য বলেই বিবেচিত হয়। এ সামান্য জীবনই অসামান্য গৌরবকে ধারণ করতে পারে যদি জীবনে থাকে সময়ানুবর্তিতা । বলা চলে, সময়ানুবর্তিতাই হচ্ছে জীবনে সাফল্যের একটি সিড়ি।

সময়ের সদ্ব্যবহার:

এ জগৎ-সংসারের অনেক কিছুরই আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা যায় । কিন্তু সময়ের মূল্য নিরূপণ করা সম্ভব নয় । জন্ম ও মৃত্যুর শাসনে জীবন সদা সংকুচিত। আশা করলেও মানুষ অন্তহীন জীবন পায় না। এখানেই জীবনের চরম ট্রাজেডি। কবি সুইনবার্গ বলেছেন—

‘life is a vision or a watch between a sleep and a sleep.’

দুই প্রান্তের ঘুম, ঘুমের মতাে অন্ধকার, মাঝখানে একটু চেয়ে থাকাটা জীবন। তাই জীবন যখন এতই অল্প সেজন্যই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে। সময়ের সদ্ব্যবহারই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষকে অবিনশ্বর করে বাঁচিয়ে রাখে। বিশ্বে বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, দেশনায়ক, গবেষকসহ সকল কীর্তিমানবরাই সময়ের সদ্ব্যবহার করেছেন। ছাত্রজীবনেও সময়ের সদ্ব্যবহার করলে।
জীবন গঠন সহজ হয়।

সময়ের গুরুত্ব:

প্রতিটি মানুষের জীবনে সময় অতি মূল্যবান রত্ন। সময় একবার চলে গেলে জীবনের বিনিময়ে হলেও তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সময়ের সদ্ব্যবহার করলে সফলতা হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয়। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে স্মরণীয় করে রাখে কর্মের মহিমা। তাই সময়কে কাজে লাগিয়ে কর্মের মহিমা সৃষ্টি করা প্রত্যেকের কর্তব্য। সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে কবি বলেন:

"খেলায় মজিয়া শিশু কাটাইওনা বেলা সময়ের প্রতি কভু করিওনা হেলা"

মানবজীবনে সময়ের মূল্য:

যে সময়ের যে কাজ, তা সেই সময়ে সম্পাদন করা।যে তা করে না, সে সময়ের অমর্যাদা করে এবং পরাজয়ই হয় তার জীবনের চরম পরিণতি।সময়ের এই অবহেলার জন্য ভবিষ্যতে তাকে অনুশোচনা করতে হবে।যে কৃষক ফসলের ঋতুতে ফসলের বীজ বপন না করে আলস্যে সময় অতিবাহিত করে, সে কিভাবে ফসল ওঠার সময় খামার পূর্ণ ফসল আশা করতে পারে? সময় চলে গেলে তখন কান্নাকাটি করেও লাভ হয় না।প্রবাদে আছে-

সময়ে না দেয় চাষ

তার দুঃখ বার মাস।

মানবজীবনেও সেই একই কথা।জীবনে যখন শক্তি থাকে, সামর্থ্য থাকে, তখন আলস্যে অযথা কালহরন করে জীবন কাটালে শেষ বয়সে অবশ্যই দুঃখ ভোগ করতে হয়।তাই সময়ের মূল্যবোধের গুরুত্ব অনেক।


ছাত্রজীবনে সময়ের মূল্য:

ছাত্রজীবনে সময়ানুবর্তিতার মূল্য সর্বাধিক। কর্ম জীবনের সাফল্য নির্ভর করে ছাত্রজীবনের সময়ের সঠিক মূল্যায়নের ওপর। নিয়মিত পাঠ্যাভাস ও শরীরচর্চার মাধ্যমে শৃংখলা আর সংযম গড়ে ওঠে। ছাত্রজীবনের দৈনন্দিন কর্মসূচিকে যারা অবহেলা করে তারাই জীবনে সাফল্যের সোনার কাঠির পরশ থেকে বঞ্চিত হয়। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছেন, "সময়ের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা নেই, তারাই পৃথিবীতে নিঃস্ব, বঞ্চিত ও পরমুখাপেক্ষী।"

সময় অপচয়ের ফলশ্রুতি:

সময়ের অপচয় করলে সমস্ত জীবনই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। যে সময় অপচয় করে তার উন্নতি কিছুতেই আশা করা যায় না। উন্নতি তো দূরের কথা মানুষ হিসেবে বাঁচাই দায় হবে।

সময়ের মূল্যবোধ:

পৃথিবীর মধ্যে যতো ধন-সম্পদ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সময়। পৃথিবীর মধ্যে অনেক দুর্লভ বস্তুই টাকা দিয়ে কোন যায়, কিন্তু যে সময় একবার চলে যায় তা পৃথিবীর বিনিময়ে হলেও ফিরে পাওয়া যায় না। তাই সময় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

মনীষীদের সময়ানুবর্তিতা:

আমরা মহাজ্ঞানী, মহাজন তথা স্মরণীয় পুরুষদের জীবনে দেখতে পাই, তারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়েছেন। আবহেলায় কোনো সময় বৃথা নষ্ট করেননি। সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ফলেই তাঁরা জীবনে সফল হতে পেরেছেন। মরেও অমরতা লাভ করেছেন। নিউটন, আইনস্টাইন, এডিসন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সক্রেটিস, প্লেটো, শেক্সপিয়র প্রমুখ সময়ের মূল্য দিয়েছেন, তাই তাঁরা আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আদি যুগে সময়ের মূল্য:

প্রাগৌতিহাসিক যুগের অরণ্যচারী গুহাবাসী আদিম মানুষের জীবনে সময়ের কোনো মূল্যবোধ ছিল না।সমাজ ও সভ্যতার ভিত রচিত হবার পর থেকেই মানুষের জীবনে সময় মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।এবং নশ্বর মানুষ অবিনশ্বর হতে সচেষ্ট হয়।এরপর থেকে মানুষ প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে কাজে লাগানোর সাধনায় উঠে- পড়ে লাগে।তারই অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি হিসেবে মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্রুত উন্নতি ও বিকাশ সাধিত হতে থাকে।

আধুনিক যুগে সময়ের মূল্য:

সময়ের দাবি মিটিয়েই আধুনিক যুগ আজ সভ্যতার বেদিমূলে উপনীত হয়েছে।যারা সময়ের মূল্য প্রদান করে না, তারা গতিহীন, স্থবির ও মৃতপ্রায়।তাদের জীবনে কোনো সম্ভাবনা কখনো হাতছানি দেয় না।বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের ফলে সময়ের বর্তমান মূল্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।আবিষ্কৃত হয়েছে শব্দের গতির চেয়েও গতিসম্পন্ন কনকর্ড বিমান।মানুষ আজ কয়েক ঘন্টায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পাড়ি জমাচ্ছে।বিশ্ব আজ মানুষের হাতের মুঠোয়।জীবনের সর্বত্রই এসেছে গতি।

সময়ানুবর্তিতার প্রয়ােজনীয়তা:

যে জীবন সফলতার জন্যে উন্মুখ সে জীবনে সময়ানুবর্তিতার প্রয়ােজন সর্বাধিক। যার জীবনে। সময়ানুবর্তিতা নেই তার জীবনে সফলতার আশা করা বৃথা । অনন্ত কালপ্রবাহে মানুষ বেঁচে থাকে তার সুকীর্তির মধ্য দিয়েই। সুকীর্তি নির্মাণ তার পক্ষেই কেবল সম্ভব যার পক্ষে সময়ানুবর্তী হওয়া সম্ভব। মানুষ পৃথিবীকে সভ্যতার উচ্চশিখরে আজ আসীন করতে পেরেছে সময়ানুবর্তিতা চর্চার মাধ্যমেই। কবি বলেছেন–

‘নদী আর কালগতি উভয়ে সমান
অস্থির প্রবাহে করে উভয়ে প্রয়াণ।

তাই সময়ের এ প্রবহমান ধারা থেকে সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানাের মধ্যে জীবনের সাফল্য নির্ভর করে। সময়ানুবর্তিতার মধ্যে মানবজীবনের কৃতিত্ব নিহিত। ঘাসের ডগায় চিকচিক করা শিশিরের মতাে মানবজীবন- যে জীবন প্রভাতেই মিলিয়ে যায় সূর্যের প্রথম সাক্ষাতে। তাই ক্ষণস্থায়ী এ জীবনকে একটি চিরস্থায়ী সম্মানিত আসনে রেখে যেতে হলে প্রয়ােজন সময়ের অনুবর্তী হওয়া।

উপসংহার:

মানুষের জীবন দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আসবে না।তাই মানুষের উচিত এ জীবনকে পরিপূর্ণ করে গড়ে তােলা।এজন্য সময়ানুবর্তিতা একান্ত প্রয়ােজন।সময়ানুবর্তী জীবন উজ্জ্বল জীবনের উপমা।মানুষের সবথেকে বড় অপরাধ হচ্ছে সময়ের অপচয় করা।যারা সময়কে অবহেলা করে তারা জীবনে উন্নতি করতে পারে না। সময় যেহেতু জীবনের সব সাফল্য এবং সুখের মূল তাই আমাদের উচিত সময়ের সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সজাগ দৃষ্টি স্থাপন করা। আমাদের সকলকে একটি কথা মনে রাখা উচিত।

No comments

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.